কে.সি কলেজ থেকে বিদায় নিলেন অধ্যক্ষ ড. বি এম রেজাউল করিম

350

কে.সি কলেজ থেকে বিদায় নিলেন অধ্যক্ষ বি এম রেজাউল করিম

স্টাফ রিপোর্টার,ঝিনাইদহ অনলাইনঃ

বলা হয়ে থাকে, মা-বাবা সন্তান জন্ম দিয়ে পৃথিবীর আলো দেখান; আর শিক্ষক দেখান জ্ঞানের আলো। শিক্ষক মানুষ গড়ার কারিগর, অভিভাবকের মত ছাত্র-ছাত্রীর পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্বও শিক্ষকের। তার জন্যই তো আমার-আপনার বর্তমানের অবস্থান। আজকে আমরা এমনই একজন শিক্ষকের কথা জানাবো যিনি শিক্ষকের চেয়েও একটু বেশি বন্ধুসুলভ, খাটি একজন মানুষ। বলছি ১৯৬০ সালের ১৭ মার্চে প্রতিষ্ঠিত ঝিনাইদহের ঐতিহ্যবাহি বিদ্যাপীঠ কে.সি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ বি এম রেজাউল করিম স্যারের কথা।

ঝিনাইদহের শৈলকূপা উপজেলার কামান্না গ্রামে গোলাম সরোয়ার ও সাহেরা খাতুন দম্পতির ঘরে জন্মগ্রহন করেন এই মহান শিক্ষাগুরু। ১৯৭৮ সালে কামান্না বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শেষে ভর্তি হন ঝিনাইদহ সরকারী কে.সি কলেজে সেখান থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ১৯৮০ সালে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর ১৯৯০-১৯৯১ শিক্ষাবর্ষে পি,এস,ডি কোর্সে ভর্তি হন। এরপর কাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক চেতনা নিয়ে ১৯৯৫ সালে সুপার ভাইজার প্রফেসর ডাঃ মজির উদ্দিন মিয়ার তত্বাবধায়নে পি,এস,ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
পড়াশোনা শেষে নিজের জ্ঞান সমাজের কল্যানে বিলিয়ে দিতে আবিভূত হন মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে। ১৯৯২ সালের ৩১শে আগস্ট কালীগঞ্জ শহরের মাহাতাব উদ্দিন ডিগ্রী কলেজে বাংলা প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ১৯৯৯ সালের ৬ই জানুয়ারী সাতক্ষীরা সরকারী কলেজে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তারপর ২৫শে ডিসেম্বর ২০০০ সালে তিনি ঝিনাইদহ সরকারী কে সি কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের পর প্রমোশন পেয়ে ২৩শে জুন ২০০৩ সালে সরকারী এমএম কলেজ যশোর। ৩০শে মার্চ ২০১০ সালে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে সরকারী কে.সি কলেজ ঝিনাইদহ। ২০১০ সালের ১৩ই ডিসেম্বর থেকে ২০১১ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব শেষে ২০১২ সালের ২৩শে জুন প্রফেসর হিসেবে যোগদান করেন সরকারী মহিলা কলেজ যশোর। তারপর প্রিন্সিপাল হিসেবে ২০১৩ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী মেহেরপুর সরকারী কলেজে শিক্ষাকতা করেন তিনি।

এরপর আবার ফিরে আসেন নিজের সেই প্রিয় বিদ্যাপীঠে। তবে এবার আসলেন অধ্যক্ষ হিসেবে। ২০১৪ সালের ৮ই মার্চ সরকারী কে.সি কলেজ ঝিনাইদহে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। তিনি আসার পর থেকেই পরিবর্তনের ছোয়া লাগে প্রতিষ্ঠানটিতে।

শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে গ্রহন করেন নানা উদ্যোগ। সকল শিক্ষার্থীদের তিনি সন্তানের মত আগলে রাখতেন। শিক্ষক-কর্মচারীদের কাছেও তিনি ছিলেন প্রিয় ব্যক্তিত্ব। সবার সাথে তাঁর আচরণ বন্ধুসুলভ। তাঁর সময়ে কলেজ ক্যাম্পাস ছিল প্রায় শান্ত, গল্ডগোল তেমন চোখে পড়েনি। সামাজিক-সংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ রাষ্ট্রীয় নানা কর্মসূচিতে মুখর ছিল পুরো ক্যাম্পাস। কলেজের শিক্ষার মানও উন্নত হয়েছে আগের যে কোন সময়ের চেয়ে।

ছাদবাগান, তথ্যকেন্দ্র, ব্যায়ামাগার, মেডিকেল সেন্টার, ছাত্রীদের পিরিয়ড কালীন সু-ব্যবস্থায় বিশেষায়িত রুম, ৫টি ভাষার ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব, জোলোজি বিভাগে প্রায় ৩০০ টি বিপন্ন প্রানীর মিউজিয়ামসহ নির্মাণ করেছেন সবুজ ক্যাম্পাস।

শিক্ষার্থীদের পথ প্রদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি লেখালেখির অভ্যাসটাও ছোট থেকেই। তিনি প্রায় ১৫টি গল্প, প্রায় ২০০এর অধিক ছড়া-কবিতা ও ৪০টির মত প্রবন্ধ রচনা করেছেন। ফোকলর নিয়ে গবেষণা, গবেষণামূলক লেখা ঝিনাইদহের মুক্তিযোদ্ধা ও ঝিনাইদহের সাংস্কৃতি নিয়েও তিনি লেখালেখি করেছেন। শুধু শিক্ষক নয় উদার মনের মানুষ হিসেবে তিনি জড়িয়ে আছেন ঝিনাইদহের মানুষের সাথে।

শিক্ষার্থীদের বটবৃক্ষের ন্যয় ছায়াদানকারী, শিক্ষার্থীদের পিতৃত্যুল্য কর্মবীর এই মানুষটির আজ সরকারি কেশব চন্দ্র কলেজে তার কর্ম জীবনের ছিলো শেষ দিন। আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছেন তিনি। মানুষটার বিন্দুমাত্র অহংবোধ নেই; কিন্তু এক গভীর মমত্ববোধ আছে কলেজের প্রতিটা জীব ও জড়’র প্রতি। কলেজের প্রতিটা ভবন, নিজ হাতে রোপণ করা বৃক্ষরাজি, রাস্তা, এমনকি ধূলিকণারাও হয়তো নিঃশব্দে কাঁদছে তাঁর এই বিদায়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here