ভারত উপমহাদেশে চিরুনী ও বোতাম শিল্পের জনক ঝিনাইদহের মন্মত নাথ ঘোষ

164

আসিফ কাজল, ঝিনাইদহঃ

ঝিনাইদহের মানুষের কৃতিত্বগাথা কর্ম সম্পর্কে আমরা কজনই বা জানি। যুগে যুগে এই জেলার মানুষ সমৃদ্ধ করেছে ইতিহাসকে। অথচ ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম নেই। কালেভাদ্রে প্রচারণায় উঠে আসে তাদের নাম। তেমনই একটি নাম হচ্ছে মন্মত নাথ ঘোষ। এই মন্মত নাথ ঘোষ ভারতীয় উপমহাদেশে বোতাম ও চিরুনি শিল্প সমৃদ্ধ করেছিলেন। চিরুনি প্রথম তৈরি করেছিলেন মিশরের মানুষ, ঐতিহাসিকভাবে এটাই সত্যি। যতদিন চিরুনি মানুষের হাতে আসেনি, ততদিন জটাধারী মানুষের সংখ্যা বেশি ছিল, সন্দেহ নেই। প্রাচীন মানুষের মাথায় চিরুনির অভাবে পোকা জন্মে রোগ হত। তবে মিশরে চিরুনির আবিস্কার হয়েছিল খ্রিষ্টজন্মের অনেক আগে। ভারত উপ-মহাদেশে সেই চিরুনি এসেছিল খ্রিষ্টজন্মের পাঁচ-সাতশ বছর পরে। কিন্তু সেই চিরুনির সাথে বর্তমান চিরুনির কোন মিল নেই। মোটামুটি ব্যবহারযোগ্য, ভদ্রস্থ, চিরুনি এদেশে এসেছিল ব্রিটিশ শাসনের আগে দিয়ে। সেগুলি ছিল কাঠ, পশুর হাঁড়, মহিষের সিং, হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোলা ও পিতল দিয়ে তৈরী। আর সেগুলি ছিল রাজা-উজিরদের ব্যবহারের জন্য। অষ্টাদশ শতাব্দীতে কলকাতা-ঢাকায় পশুর হাঁড় থেকে সামগ্রী তৈরীর কারিগরেরা চিরুনি বানাতো। কিন্তু তখনো চিরুনি শিল্প হিসাবে উঠে আসেনি। ১৮২৪ সালে ব্রিটিশ রসায়নবিদ মিঃ লাইন ইংল্যান্ডে প্রথম রাসায়নিক দিয়ে চিরুনি তৈরী করেন। সেই চিরুনি উনিশ শতকের মাঝামাঝি অবিভক্ত ভারতে আসে। তবে সে সময় জার্মানির গাটাপার্চারের চিরুনি সারা বিশ্বে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। উনিশ শতকের শেষের দিকে সেলুলয়েডের চিরুনি জাপানে কুটিরশিল্প হিসাবে ছড়িয়ে পড়ে। তারপরে তা ছড়িয়ে পড়ে চীন ও ইউরোপের দেশগুলিতে। তখনো ভারতীয় উপমহাদেশে চিরুনি শিল্প গড়ে ওঠেনি। ইতিহাসে এমন কোন তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। পশ্চিমবঙ্গের নদীয় জেলার কৃষ্ণনগরের বøগার দিপক রায় তার এক লেখায় তুলে ধরেন চিরুনি শিল্পের সাথে যে মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে, তিনি হলেন মন্মথ নাথ ঘোষ। ঝিনাইদহ শহরতলী মথুরাপুর গ্রামের মন্মথ নাথ ঘোষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে অনুপ্রানিত হয়ে কারিগরী বিদ্যা শিখে স্বদেশী কারখানা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯০৬ সালে জাপানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ৩ বছর ছিলেন। যাওয়ার আগে তিনি আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের পরামর্শ নিয়েছিলেন। বহু কষ্টে তিনি সেখানে চিরুনি নির্মানের কৌশল শিখে ১৯০৯ সালে দেশে ফিরে এসে যশোর শহরে ১৯১০ সালের মাঝামাঝিতে প্রথম চিরুনি কারখানা স্থাপন করেন। এই কারখানার সব যন্ত্রাদি জাপান থেকে এনছিলেন তিনি। এই কাজে তাঁকে অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছিলেন যশোরের জমিদার প্রমথ ভূষন দেবরায়, কাশিমবাজারের মহারাজা মনীন্দ্রচন্দ্র নন্দা ও বর্ধমানের মহারাজা বিজয়চাঁদ মহতাপ বাহাদুর। কারখানার নাম দেওয়া হয়েছিল, ‘যশোর কম্ব বাটন এন্ড ম্যাট ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি লিমিটেড’। ঝিনাইদহের প্রচুর যুবককে এই কাজে তিনি নিয়োগ করেছিলেন। এই চিরুনি সারা বাংলা, সারা দেশে জনপ্রিয়তা পায়। ফলে বিদেশের চিরুনির বিক্রি কমে যায়। মন্মথবাবু কলকাতা, হাওড়াতে পরিচিত বন্ধুদের চিরুনি কারখানা গড়ায় উৎসাহ দিতে থাকেন। কিন্তু তার এই স্বদেশী কাজকে সহ্য করতে পারেননি দেশের অনেকেই। তাঁর জাত গিয়েছে বলে, তাকে একঘরেও করা হয়েছিল তখন। ব্রিটিশ পুলিশও পিছনে লেগেছিল তার। শেষ পর্যন্ত ১৯১৯ সালে তিনি তার চিরুনি কারখানা নিজের ভাই ফনীভূষনের হাতে সঁপে দিয়ে কলকাতায় গড়পাড় রোডে চলে যান। কলকাতাতে গিয়ে তিনি চিরুনি তৈরীর মেশিন বানানোর কারখানা গড়েছিলেন। কিন্তু সেই কারখানায় উৎপাদন শুরুর আগেই তিনি ১৯৪৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার সেই কারখানা আজো আছে মানিকতলার খালপাড়ে। গত ২০ শে মার্চ ভারতের, বাংলাদেশের, ভারতীয় উপমহাদেশের চিরুনি শিল্পের জনক মন্মথনাথ ঘোষের ৭৭ তম মৃত্যু বার্ষিকী চলে গেছে। একজন প্রচারের আলোয় না থাকা শিল্পদ্যোগীর কথা আজকের প্রজন্মের কেও জানে না। অথচ এই শিল্পকে এই উপমহাদেশে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন ঝিনাইদহের মন্মথ ঘোষ। তার কল্যানে মানুষ আজ সহজলভ্য দামে চিরুনি কিনে ব্যবহার করতে পারছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here