শৈলকুপায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ প্রকল্পের ঘর বরাদ্দে দুর্নীতি উৎকোচ দিতে না পারায় ঘর পেলো না গৃহহীন আদিবাসিরা

121

ঝিনাইদহ প্রতিনিধিঃ

শৈলকুপায় আদিবাসিদের আর্থ সামাজিক অবস্থার জীবনমানের উন্নয়ন সাধনে “যার জমি আছে ঘর নেই” প্রধানমন্ত্রীর আশ্রায়ন প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে প্রতিটি সেমিপাকা বসতঘর নির্মাণে দুইলাখ বিশ হাজার টাকা বরাদ্দের পরও দশটি ঘরনির্মাণে দশজনের নিকট থেকে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে পাঁচ লক্ষাধিক টাকা। ঘরনির্মাণ কাজেও দেওয়া হয়েছে শুভংকরের ফাঁকি।

ঘর বরাদ্দ পাওয়া নির্বাচিত ব্যক্তিরা হচ্ছেন-দিগনগর ইউনিয়নের বিমল কুমার সরকারের মেয়ে সুমিত্রা রানী, নগেন সরকারের মেয়ে সুমিত্রা রানী, দিলিপ সরকারের ছেলে মিঠুন সরকার , মনোহরপুর ইউনিয়নের দাস শ্যামল চন্দ্র দাসের মেয়ে ইতি রানী, গনেশ দাসের ছেলে অসিত দাস, হাকিমপুর ইউনিয়নের মৃত্য অর্জুন সরকারের ছেলে সুন্দরী সরকার, চিত্তরঞ্জন সরকারের ছেলে বিষ্ণু কুমার সরকার, সারুটিয়া ইউনিয়নের শচিন দাসের মেয়ে শ্রীমতি পুষ্প রানী সরকার, সুভাস কুমার সরকারের ছেলে লিটন সরকার ও কাঞ্চন সরকারের মেয়ে শ্রীমতি রুপা রানী সরকার।

সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগ আদিবাসিদের জীবনমান উন্নয়নে বসতঘর নির্মাণে দুইলাখ বিশ হাজার টাকা ঘরপ্রতি বরাদ্দের পরও প্রত্যেকের নিকট থেকে চল্লিশ, পঞ্চাশ ও ষাট হাজার টাকা ঘর বরাদ্দ বাবদ উৎকোচ গ্রহণ করা হয়েছে। গৃহহীন কমল কুমার দাসদের মত উপজেলা নির্বাহী অফিস স্টাফ ইসমাইল ও মিন্টু’র দাবিকৃত টাকা যারা দিতে ব্যর্থ হয়েছে তাদের ভাগ্যে ঘর জোটেনি। অভিযোগ রয়েছে উপজেলাতে সাতটি আদিবাসী সমিতি সংগঠন থাকলেও উপজেলা নির্বাহী অফিসের পছন্দের দুই-তিনটি সমিতির লোকদের টাকার বিনিময়ে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
অগ্রগতি আদিবাসি বহুমূখি সমবায় সমিতি, কচুয়া মধুদাহ আদিবাসি কল্যাণ বহুমূখি সমবায় সমিতি, কুমিড়াদহ আদিবাসি শ্রমজীবি সমবায় সমিতি, হাটফাজিলপুর আদিবাসি মৎসজীবি সমবায় সমিতি ও শৈলকুপা আদিবাসি দারিদ্র বিমোচন সংস্থাকে ব্যতিরেখে দু’টি পছন্দের সমিতিকে ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক বরাবর ২০১৯-২০২০অর্থ বছরের আদিবাসিদের বসতঘর নির্মাণে অর্থ বরাদ্দে দুর্নীতি প্রসঙ্গে ছয়টি সমিতির যৌথ স্বাক্ষরে একটি লিখিত দরখাস্ত জমা দেওয়া হয়। দরখাস্তে জানা গেছে, উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাইফুল ইসলাম কোন রেজুলেশন ছাড়ায় গোপনীয়ভাবে সততা আদিবাসি সমাজ কল্যাণ সংস্থা তামালতলা রেজিঃনং ৮২৬/০৯ এর সভাপতি রাম সরকার এবং উপজেলা নির্বাহী অফিস স্টাফ ইসমাইল ও মিন্টুর মাধ্যমে ঘরপ্রতি পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ গ্রহনে দশটি ঘর দশজনকে পাঁচলাখ টাকার বিনিময়ে বরাদ্ধ দেয়া হয়েছে বলে দরখাস্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
জানা গেছে, শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী অফিস স্টাফ ইসমাইল ও মিন্টু এবং সততা আদিবাসী সমাজ কল্যাণ সংস্থা, তামালতলা, রেজিঃ নং-৮২৬/০৯ এর সভাপতি রাম সরকার এর মাধ্যমে বেনীপুর সরদার পাড়ার কল্পনা-১ ও কল্পনা-২ এর নিকট থেকে আদিবাসিদের “যার জমি আছে ঘর নেই” প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্পের আওতায় ঘর বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে দুই জনের নিকট থেকে পঁচিশ হাজার এবং আঠার হাজার টাকা অগ্রিম নেওয়া হয়েছে।
অগ্রগতি আদিবাসি বহুমূখি সমবায় সমিতির সভাপতি উৎকোচ দিতে না পারায় ঘর বরাদ্ধ থেকে বঞ্ছিত গৃহহীন আদিবাসিরা ও কমল চন্দ্র দাস বলেন, আদি বাসিদের নামে প্রকল্প করতে আমরা প্রত্যেক সমিতি পাঁচ হাজার করে টাকা দিয়েছি। আমরা পাঁচ হাজার করে টাকা দেওয়ার পর প্রজেক্ট পাসহয়ে আছে। প্রজেক্ট আসার পর অফিসে গিয়ে ইউওনো সাহেবকে বললাম স্যার আমার একটা সমিতি আছে পশু হাসপাতালের সামনে। আমরা গরিব মানুষ স্যার আমার সমিতির দিকে একটু লক্ষ রাখবেন। স্যার বললো ঠিক আছে, তোমার প্রতি আমার লক্ষ থাকবে। স্যারের কক্ষ থেকে চলে এসে ইসমাইলের নিকট যায়, তিনি তখন বলেন তুমি চলে যাও আমি ফোন দিবো। দুইদিন পর ইসমাইল ফোন দিয়ে বলে আমাদের মিটিং আছে তুমি এসো। আমি গেলে বলে যে তুমি মিন্টুর সাথে কথা বলো, মিন্টুর সাথে কথা বলা আর আমার সাথে কথা বলা একই কথা।
মিন্টুর কাছে গেলে মিন্টু বলে যে তুমি কি ঘর নিবা। দু’টো ঘর তোমাকে দিতে পারি, একলাখ টাকা লাগবে। তখন আমি বললাম স্যার আমি একলাখ টাকা দিয়ে ঘর নিবো না। স্যার আমরা কখনো শুনিনি যে টাকা দিয়ে আপনাদের নিকট থেকে ঘর কিনে নিতে হবে। তাহলে স্যার আমি নিবো না। আপনি যেভাবে যাদের পারেন দিয়ে দেন বলে চলে আসি। তিন-চারদিন পর একদিন রাম থানার সামনে থেকে আমাকে ডেকে বললো, চলো শামীম মোল্লার তিনতলার নিচে গিয়ে বসি, সেখানে ইসমাইল আসবে বলে আমাকে নিয়ে সেখানে যায়। কিছুক্ষন পরে সেখানে ইসমাইল আসলো এবং বললো ঘরতো সব রামের নামে তা কমল তুমি কি বলো, ঘর নিতে হলে একলাখ টাকা দিতে হবে। তখন আমি বললাম একলাখ টাকা দিয়ে কোনো ভাবেই স্যার আমি ঘর নিতে পাছি না। তখন তারা চলে গেলেন, আমিও সেখান থেকে চলে আসি।
ইতি রানী দাসের স্বামী শ্রী শ্র্যামল চন্দ্র দাস কানাই বলেন, আমাদের উঠান আর নির্মাণ ঘরের মেঝে সমান হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি হলে ঘরে পানি, সাপ-পোকা ঢুকে যাবে।ধুলা মাটি দিয়ে এবং সিমেন্ট কম দিয়ে, দুই নাম্বার ইট দিয়ে ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।সরকার দুইলাখ বিশ হাজার টাকা ঘরপ্রতি বরাদ্দ দেওয়ার পরও আমার নিকট থেকে চল্লিশ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। পাকা ঘর পাওয়ার আসায় খুব কষ্ট করে হলেও চল্লিশ হাজার টাকা গুছিয়ে দিয়েছি।
কুমার সরকার, শম্ভু সরদার, গোপাল বিশ্বাস ও দিলীপ বিশ্বাস বলেন, উপজেলা নির্বাহী অফিসের স্টাফ ইসমাইল ও মিন্টু টাকা ছাড়া আদিবাসিদের কোন কাজই করেন না। যে সমিতির সভাপতি তাদের উৎকোচ বেশি দিতে পেরেছে সেই সমিতির লোকদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। শৈলকুপায় এ যাবদ আদিবাসিদের নামে যত টাকা বরাদ্দ এসেছে প্রায় সময়ই অফিস স্টাফদের মোটা অংকের ঘুষ দেওয়া লেগেছে।
শৈলকুপা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি এবং এমন কোন ঘটনা ঘটেওনি। আমার অফিসের কোন ব্যক্তি এবিষয়ে দায়ি থাকলে প্রমান সাপেক্ষে অবশ্যই টাকা ফেরৎ দেওয়া হবে এবং তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here